স্বৈরাচারের পথ খুললে শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে: প্রধানমন্ত্রী
ঢাকা, ১৯ অক্টোবর ২০২৬: বিরোধিতার নামে স্বৈরাচার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করা হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক বিরোধিতা হতে হবে গঠনমূলক এবং জাতীয় স্বার্থকে দিতে হবে অগ্রাধিকার।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়ন করা উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েরই দেশের স্বার্থে কাজ করার দায়িত্ব রয়েছে। সংসদে আলোচনা, যুক্তিতর্ক এবং পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো মৌলিক বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের পাশে থাকার আহ্বান
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ শুধু বক্তব্য দেওয়া নয়; বরং শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আহতদের সহায়তা করা এবং তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করা।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রত্যাশার মধ্যে মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে, গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার কাজ করছে।
উদ্বোধন করা হলো ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ
সোমবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাহারিয়ার খাঁন আনাস ও ওয়াসিম আকরামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন তিনি।
প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ৯০ ফুট উঁচু এই স্মৃতিস্তম্ভে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভের রিলিফ ভাস্কর্যে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
আধুনিকায়ন করা হয়েছে ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের এই উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পে পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। সংরক্ষণ করা হয়েছে বিদ্যমান গাছপালা; পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ গড়ে তোলা হয়েছে।
উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থাও।
উন্নয়নকাজে প্রকৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, তবে পরিবেশের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমাতে হবে। বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
পরিচ্ছন্নতা ও জনসেবার মান বাড়ানোর তাগিদ
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে আরও মনোযোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়তে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।