ইরানকে আবারও ধ্বংসের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের, আলোচনার প্রস্তাব তেহরানের
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরানের বাকি অংশেও বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেশটির প্রায় ২৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তবে সম্ভব হলে দেশটির বাকি অংশ ধ্বংস করতে চান না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা শিগগিরই জানা যাবে বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন পারমাণবিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে এই প্রস্তাব পৌঁছানো হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে আগে দেওয়া সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে চায় না তেহরান।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনকে দেওয়া শর্তগুলো বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া কিংবা আলোচনায় বসার বিষয়ে ইতিবাচক হবে না ইরান।
তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং মার্কিন নৌ অবরোধের অবসানসহ অন্যান্য বিষয়। তবে প্রস্তাবটির পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, যেকোনো প্রাথমিক সমঝোতার আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, গত কয়েকটি পৃথক ঘটনায় পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ও একটি টাগবোট আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজগুলো অনুমোদনহীন বা ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে চলাচলের সময় নৌমাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
তবে এসব ঘটনার বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর পরিচয় পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্ববাজারে আবারও ১০০ ডলারের কাছাকাছি তেল
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৫৮ ডলারে পৌঁছায়। আগের দিনের তুলনায় দাম বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ৩৮ ডলারে।
তবে সপ্তাহের সামগ্রিক হিসাবে দুই ধরনের তেলের দামই প্রায় ১২ শতাংশ কমার পথে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের রাজনৈতিক ধাক্কার পর ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকেই তেলের দামে বড় পতন হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি আবারও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন তুরস্কের
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তুরস্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করেছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটে ২৭৯ জন আইনপ্রণেতা চুক্তির পক্ষে এবং ১১৯ জন বিপক্ষে ভোট দেন।
চুক্তির মূল বিষয় হলো, তিন দেশের কোনো একটি রাষ্ট্র বাইরের কোনো দেশের সশস্ত্র হামলার শিকার হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের ওপরও আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সে ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ব্যবস্থা নিতে পারবে।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নেতাদের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগের মধ্যে চুক্তিটি অনুমোদন পেল। তবে চুক্তি অনুমোদন মানেই সৌদি আরবে তুরস্কের সেনা পাঠানো হচ্ছে, এমন নয়। সেনা মোতায়েনের জন্য আলাদা আইনি ও সংসদীয় প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে।
যুদ্ধের অবসান, নাকি আরও বড় সংঘাত?
একদিকে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি, অন্যদিকে ইরানের নতুন পারমাণবিক প্রস্তাব—দুই দেশের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। ইরানের সাতটি শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থানের মধ্যে সমাধান না এলে সংঘাত আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং তেহরানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির দিকে।