ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি ট্রাম্পের?
ইরানে আবারও সামরিক হামলার সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় অভিযান চালানোর জন্য সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ। তবে এসব পরিকল্পনার কোনটি বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নতুন করে হামলা চালানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে। হোয়াইট হাউসের অনুমোদন পেলে এসব পরিকল্পনা কার্যকর করা হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের জন্যও একাধিক সামরিক বিকল্প তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে নির্বাচনের পরই হামলা হবে, এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। শনিবার তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে খুব শিগগিরই ইরানে হামলা চালাতে পারে। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে একটি বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
এর আগে শুক্রবার এক সমাবেশে ট্রাম্প ইরানে আরেকটি সীমিত সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেন। এ সময় তিনি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তোলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল এটি।
কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হতে পারে?
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সেন্টকমকে নির্দেশ দিয়েছিল পেন্টাগন।
প্রতিবেদনে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব স্থাপনায় হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এসব প্রতিবেদন নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
তবে সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা এবং বাস্তবে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের অভিযান শুরু হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো একটি গোয়েন্দা স্মারকে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
স্মারকে দাবি করা হয়, বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণঘাতী হামলার কিছু পরিকল্পনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রকাশ্যে আসা স্মারকে সম্ভাব্য হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বা তা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করা হয়নি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে জনবল কমানোর নির্দেশও দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আলোচনার পথ এখনো খোলা?
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন তিনি।
চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো জুলি নরম্যানের মতে, সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে অভিযান চালানোর বিকল্পও হাতে রাখছে।
তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা বজায় রাখছে, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথও পুরোপুরি বন্ধ করছে না।
আবারও বড় সংঘাতের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ইরানের পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে তা কতটা কার্যকর হবে, কিংবা এর মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বিরোধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দেন, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। আপাতত দুই সম্ভাবনাই খোলা রয়েছে।