ud24news
২৮ অগাস্ট ২০২৬, ৬:৪৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: নিহত প্রায় ৪৭০, নিখোঁজ দেড় হাজার

Spread the love

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হিমবাহ ধস: বন্যায় ৪৭০ জনের বেশি নিহত, নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার

 

হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৪৭০ ছাড়িয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৬৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে, আর চীনের তিব্বত অংশে আরও অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত বিদেশিসহ প্রায় দেড় হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

 

বুধবার সকালে হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ, পাথর ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ধসে পাহাড়ি নদীতে পড়ার পর এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। ধসের পর সৃষ্ট প্রবল স্রোত লহেন্দে খোলা নদী হয়ে ভোতেকোশি এবং পরে ত্রিশূলী নদীর দিকে নেমে আসে। মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে নিচু এলাকার জনপদগুলোতে ভয়াবহ বন্যা ছড়িয়ে পড়ে।

 

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের রাসুয়া জেলা, যা চীনা সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। বন্যার তোড়ে বহু বাড়িঘর ধসে পড়েছে, সড়ক ও সেতু ভেঙে গেছে এবং অনেক গাড়ি পানিতে ভেসে গেছে। বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

প্রথমে ভূমিকম্পের সন্দেহ, পরে মিলল ভিন্ন কারণ

 

শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিল, ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়তো এই বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তবে পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটি মূলত হিমবাহ ও পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষ ধসের পর সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত প্রতিক্রিয়া ছিল।

 

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপালের অংশে একটি বরফ-পাথরের বিশাল ধসের ফলে ‘গ্লেসিয়ার-ইনক্লুসিভ’ বা হিমবাহ-সংশ্লিষ্ট বন্যার সৃষ্টি হয়।

 

ভূতাত্ত্বিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের ওপরের অংশ থেকে হিমবাহের বিশাল বরফস্তর, পাথর ও মাটি একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে এলে তা মুহূর্তের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হতে পারে। এই ঘটনাতেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে।

 

ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আকস্মিক এই পানির ঢলে বহু মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও পাননি।

 

মৃতদেহ মিলছে বহু দূরের এলাকায়

 

বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষের মরদেহ অনেক দূরের জেলাগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

নেপালের বিভিন্ন মর্গে মরদেহ রাখার জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া বহু মরদেহ সংরক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষ বিকল্প স্থাপনা ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদের শনাক্ত করতে নম্বর দিয়ে তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে স্বজনরা পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেন।

 

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন শত শত বিদেশি পর্যটক

 

এই বিপর্যয়ে নিখোঁজদের মধ্যে নেপালের নাগরিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। নেপালের পর্যটন বিভাগ জানিয়েছে, ৩৪টি দেশের অন্তত ৬৬৮ জন পর্যটকের সঙ্গে দুর্যোগের পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

নিখোঁজদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাদের অনেকেই পবিত্র কৈলাস-মানসসরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে নেপাল হয়ে তিব্বতের দিকে যাচ্ছিলেন।

 

চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতেও শত শত মানুষ নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে বিদেশি নাগরিকরাও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।

 

হেলিকপ্টারে চলছে উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহ

 

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হেলিকপ্টার এখন উদ্ধার অভিযানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের খোঁজা হচ্ছে এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

 

নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় তাঁবু, খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতের দেওয়া জরুরি ত্রাণসামগ্রীও দুর্গত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।

 

উদ্ধারকর্মীরা কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজদের খুঁজছেন। কোথাও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে পায়ে হেঁটে অনুসন্ধান চালাতে হচ্ছে।

 

উপর ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়া কয়েকশ শ্রমিক ও বাসিন্দাকেও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে খারাপ আবহাওয়া, নদীর তীব্র স্রোত এবং নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কা উদ্ধারকাজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

 

নতুন আতঙ্ক—ভেঙে যেতে পারে বাধা সৃষ্টি হওয়া হ্রদ

 

বন্যা ও ধসের ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি অস্থায়ী বা ‘ব্যারিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছে। এই হ্রদের পানি উপচে পড়া এবং হঠাৎ বাঁধ ভেঙে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

 

নেপালের রাসুয়া এলাকায় নদীর পানি আবার বাড়তে শুরু করলে এক পর্যায়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। চীনের তিব্বত অংশেও উদ্ধারকর্মী, যানবাহন ও স্থানীয়দের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ওই বাধাগ্রস্ত হ্রদ ভেঙে গেলে নিচের দিকে থাকা জনপদগুলো নতুন করে ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি পাহাড় ধস ও তুষারধসের ঝুঁকিও রয়েছে।

 

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী

 

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি দেখতে নুয়াকোট অঞ্চলের দিকে রওনা হয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে। নেপাল সরকার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য অনুসন্ধান, উদ্ধার ও জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় আনুষ্ঠানিক দুর্যোগ ত্রাণ আবেদন জানিয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোরখাসহ নদীতীরবর্তী বেশ কয়েকটি জেলা এই বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার আশ্বাস

 

বন্যার প্রভাব নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভারতের নেপাল সীমান্তবর্তী বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

 

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন।

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

হিমালয়ে বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি?

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং উচ্চভূমির জমাট মাটির স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার কারণে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করতে আরও বৈজ্ঞানিক তদন্ত প্রয়োজন।

 

উপগ্রহচিত্র ও প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পাহাড়ের বড় অংশ এবং হিমবাহসংলগ্ন এলাকা ধসে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন দুর্যোগ হিমালয়ের নিচের দিকের জনপদগুলোর জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

 

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

 

বর্তমানে উদ্ধারকর্মীদের প্রধান লক্ষ্য হলো—বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, নিখোঁজদের খুঁজে বের করা এবং নতুন করে বন্যার ঝুঁকি কমানো।

 

তবে যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস, প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রবল স্রোত এবং নতুন করে ব্যারিয়ার লেক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কার কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। উদ্ধার অভিযান চলার সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও আরও স্পষ্ট হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানকে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের, নতুন প্রস্তাব তেহরানের

১

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় জেডি ভ্যান্স

২

শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৩

জাপান সফর নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা

৪

শ্রমিক আন্দোলনের নামে সহিংসতা, ভিন্ন উদ্দেশ্যের অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

৫

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আইওয়া ও কানসাসে ট্রাম্পের প্রচারণা

৬

জুলাই হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা জামায়াত আমিরের

৭

রাজধানীর বাজারে কমেছে মুরগি-সবজির দাম, বেড়েছে ডিম

৮

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বড় ব্যবধানে জয়ী মির্জা ফয়সল আমীন

৯

তাহসিফ সৌরির মৃত্যু নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

১০

গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে আইনি উদ্যোগের কথা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

বাংলাদেশ-জাপান বৈঠক: ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা

১২

জাপানের সহযোগিতা চাইলেন তারেক রহমান

১৩

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৮, বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলা

১৪

ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের, কী সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প?

১৫

নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলে বিক্ষোভ, স্বাধীন তদন্তের দাবি

১৬

নাহিদ ইসলামের দাবি, পদত্যাগ করুন স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রী

১৭

জুলাইয়ের দায় স্বীকার ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতি কঠিন: পার্থ

১৮

পদত্যাগের নির্দেশকে সেরা পরামর্শ বললেন ইশরাক হোসেন

১৯

সম্প্রীতি রক্ষায় তরুণদের ভূমিকা চান রাষ্ট্রপতি

২০