
“ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস” ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যটি সঠিক নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভুল খবর। কোনো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এই খবরটি নিশ্চিত করেনি। ইরানের হামলা মূলত ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল।
আপনার পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
শিরোনাম: ইরানের নজিরবিহীন হামলা: ইসরায়েলের বুকে আঘাত হানল শত শত মিসাইল ও ড্রোন, বিশ্বজুড়ে চরম উত্তেজনা
ভূমিকা:
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি নিজ ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের ওপর সমন্বিত হামলা চালিয়েছে ইরান। শনিবার গভীর রাতে ৩০০-র বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল এবং বিস্ফোরকবাহী ‘শাহেদ’ ড্রোন দিয়ে এই নজিরবিহীন আক্রমণ চালানো হয়। দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলার জবাবে এই ‘প্রতিশোধমূলক’ পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। যদিও ইসরায়েল ও তার মিত্ররা ৯৯ শতাংশ হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে, কিছু মিসাইল ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন:
কী ঘটেছিল শনিবার রাতে?
শনিবার, ১৩ই এপ্রিল, গভীর রাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ‘অপারেশন ট্রু প্রোমিজ’ (Operation True Promise) নামে এই হামলা শুরু করে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা এই হামলায় বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়:
ড্রোন হামলা: প্রথমে ধীরগতির ‘শাহেদ’ ড্রোনগুলো পাঠানো হয় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখতে।
ক্রুজ মিসাইল: ড্রোনের পর ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয়, যা তুলনামূলকভাবে দ্রুত এবং নিচু দিয়ে উড়তে সক্ষম।
ব্যালিস্টেকি মিসাইল: সবশেষে, সবচেয়ে দ্রুতগতির এবং বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো ছোড়া হয়, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইসরায়েলে পৌঁছায়।
এই হামলা শুধু ইরান থেকেই নয়, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোও এতে অংশ নেয়।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও ক্ষয়ক্ষতি
ইসরায়েলের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত আয়রন ডোম (Iron Dome), অ্যারো (Arrow) এবং ডেভিড’স স্লিং (David’s Sling), অধিকাংশ হামলাকেই প্রতিহত করে। এই প্রতিরক্ষা অভিযানে ইসরায়েলকে সরাসরি সাহায্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জর্ডান। তাদের যুদ্ধবিমানগুলো ইসরায়েলের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই অনেক ড্রোন ও মিসাইল ধ্বংস করে দেয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, ৯৯ শতাংশের বেশি হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। তবে, কয়েকটি ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত নেভাটিম বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হানে। স্যাটেলাইট ছবিতে ঘাঁটির রানওয়ে এবং একটি স্থাপনায় সামান্য ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। ইসরায়েলের দাবি, ঘাঁটিটি সচল রয়েছে এবং এর কার্যক্রমে কোনো বড় বাধা সৃষ্টি হয়নি। হামলায় এক বেদুইন শিশু গুরুতর আহত হওয়া ছাড়া বড় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
হামলার কারণ কী?
এই হামলার মূল কারণ হলো গত পহেলা এপ্রিল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলের বিমান হামলা। ওই হামলায় ইরানের দুই শীর্ষ জেনারেলসহ IRGC-এর মোট সাতজন কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর থেকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এই হামলাকে সেই হুমকির বাস্তবায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
ইরানের এই হামলার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রতি “লৌহ কঠিন” (ironclad) সমর্থনের কথা বললেও, তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোনে জানিয়েছেন যে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা আক্রমণে অংশ নেবে না। যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত না করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘ: জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই হামলাকে “ভয়ংকর উত্তেজনা বৃদ্ধি” বলে অভিহিত করে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যান্য দেশ: যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরানের হামলার নিন্দা করেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি পাল্টা হামলা চালাবে? ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। কট্টরপন্থীরা কঠোর জবাব দেওয়ার পক্ষে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সংযম প্রদর্শনের পক্ষেও মত রয়েছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যার ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থিতিশীলতা।