
ওয়াশিংটন/তেহরান, ১৮ জুন:
দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনার পর অবশেষে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসউদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষর করেছেন, যার লক্ষ্য চলমান সংঘাত বন্ধ করা এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা।
তবে চুক্তিটি যতটা না চূড়ান্ত সমাধান, তার চেয়ে বেশি ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি কাঠামো। কারণ সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো—ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, লেবাননে হিজবুল্লাহর ভূমিকা এবং ইসরায়েলের অবস্থান—এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, আল জাজিরা, এবিসি নিউজ ও অন্যান্য সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতার মাধ্যমে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান এই নৌপথ কয়েক মাস ধরে অচলাবস্থার মধ্যে ছিল। সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে হরমুজ অতিক্রম করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সমঝোতা তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিল নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে। চুক্তিতে ইরান আবারও ঘোষণা করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ভবিষ্যতেও নজরদারি চালাবে। কিন্তু বর্তমানে ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরেনিয়ামের মজুত সীমিত করা হোক এবং আন্তর্জাতিক তদারকি আরও কঠোর করা হোক। অন্যদিকে ইরান এখন পর্যন্ত ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সম্মতি দেয়নি। ফলে এই ইস্যুই আগামী আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লেবানন প্রসঙ্গও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমঝোতা স্মারকে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানানোর কথা বলা হয়েছে এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল এই আলোচনার অংশ ছিল না। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা সমঝোতার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ ইসরায়েল যদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে লেবাননকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
চুক্তির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো উভয় দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার নতুন পথ তৈরি হওয়া। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর প্রথমবারের মতো দুই দেশ একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে সম্মত হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই সমঝোতা থেকে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও তাদের মূল লক্ষ্য—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সীমিত করা—অর্জন করতে পারেনি।
সব মিলিয়ে ১৪ দফার এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু ইউরেনিয়াম কর্মসূচি, লেবানন পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর না হলে এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
আগামী ৬০ দিনের আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
মন্তব্য করুন