
ইরানে ক্ষোভের সঙ্গে বাড়ছে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরানে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, আয় কমে যাওয়া এবং সরকারি দমন-পীড়নকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে বড় পরিসরে রাস্তায় নামার ক্ষেত্রে ভয় ও অনিশ্চয়তা এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন দেশটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী গবেষক বানি সাবাতি।
সাবাতির মতে, ইরানের মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ জমা হয়েছে। কিন্তু বড় ধরনের গণবিক্ষোভের জন্য জনগণের কাছে এমন একটি স্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারেন যে প্রতিবাদে নামলে তারা একা থাকবেন না।
অর্থনৈতিক সংকটে বাড়ছে চাপ
দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সাবাতির উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে শিক্ষকদের মাসিক আয় প্রায় ২০০ ডলার থেকে কমে ৭০ ডলারে নেমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
অর্থনৈতিক চাপের কারণে দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবীদের একটি অংশ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তুরস্কের সঙ্গে স্থলসীমান্ত ব্যবহার করেও অনেকে ইরান ছাড়ার চেষ্টা করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের সরকারি পরিসংখ্যানেও ২০২৬ সালের বসন্তে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকোচনের তথ্য পাওয়া গেছে। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রকৃত জিডিপি ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
পোশাকবিধি নিয়েও ভিন্ন পরিস্থিতি
রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের পোশাকবিধি নিয়ে আইন প্রয়োগের ধরনেও পার্থক্যের কথা জানিয়েছেন সাবাতি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্য ও দক্ষিণ তেহরানে হিজাব না পরা নারীদের নিরাপত্তা বাহিনীর আটক করার ঘটনা ঘটছে। বিপরীতে শহরের অপেক্ষাকৃত অভিজাত উত্তরাঞ্চলে একই ধরনের আচরণ অনেক ক্ষেত্রে সহনীয়ভাবে দেখা হচ্ছে।
সাবাতির দাবি, পরিস্থিতির এই পার্থক্য সরকারকে রাজনৈতিক ও প্রচারমূলক সুবিধা দেয়।
ট্রাম্পের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে বলে মনে করেন ওই গবেষক। কখনও তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন, আবার কখনও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
ফলে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলো বাস্তবে কী ধরনের সমর্থন দেবে—এ নিয়ে ইরানের মানুষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়নি বলে সাবাতির বক্তব্য।
বিদেশে থাকা বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যেও ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। রেজা পাহলভিসহ বিরোধী পক্ষের কয়েকজন নেতা সরকারের পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেও বর্তমান শাসনব্যবস্থা কীভাবে পরিবর্তন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত মহাসাগর পর্যন্ত যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার হুঁশিয়ারি
এর মধ্যেই অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা সামনে এসেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
সাফাভির বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাত পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি থেকে ইতোমধ্যে লোহিত সাগর পর্যন্ত পৌঁছেছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এর বিস্তার ভারত মহাসাগর পর্যন্ত যেতে পারে এবং সেখানেও থেমে নাও থাকতে পারে।
তিনি আরও জানান, ইরান নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার বক্তব্যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাফাভির এই বক্তব্যে প্রথমবারের মতো ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একজন উপদেষ্টা সরাসরি ভারত মহাসাগরের কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য করুন