
মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া মহড়া কমায় চীনের সুযোগ দেখছে ফিলিপাইন
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর কমে যাওয়ায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন নতুন করে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে ফিলিপাইন।
সিউলে অনুষ্ঠিত বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা ফোরাম ‘সিউল ডিফেন্স ডায়ালগ’-এর সাইডলাইনে এ বিষয়ে কথা বলেন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো। তিনি বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হলে চীন সেটিকে দ্রুত কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। তার আশঙ্কা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার কোনো অংশ দুর্বল মনে হলে বেইজিং সেখানে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তে ফিলিপাইনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানান তেওদোরো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনকে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছে যে দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে মার্কিন অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ার সময় ও মাঠপর্যায়ের কিছু প্রশিক্ষণ কমিয়ে দেয়। এর ফলে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনের বিরুদ্ধে আরও সহযোগিতার পথে ম্যানিলা
দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সরকারের সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে ম্যানিলা। যৌথ মহড়া বাড়ানোর পাশাপাশি ফিলিপাইনে মার্কিন বাহিনীর প্রবেশ ও কার্যক্রমের সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে ফিলিপাইন। তেওদোরোর মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার ফলে বিভিন্ন দেশ পরস্পরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ও সামুদ্রিক চাপের পাশাপাশি তথ্য ও প্রভাব বিস্তারের কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন। তার দাবি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মুক্ত গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে চীন বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়িয়ে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এ ধরনের বিদেশি প্রভাব ও গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলায় ফিলিপাইন আইন আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাড়াতে চায় ফিলিপাইন
দক্ষিণ কোরিয়াও ফিলিপাইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। এরই মধ্যে দেশটি ফিলিপাইনকে এফএ-৫০ যুদ্ধবিমান, ফ্রিগেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
তেওদোরো জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্পে সহযোগিতা আরও বাড়াতে আগ্রহী ম্যানিলা। তবে ফিলিপাইনের দীর্ঘদিনের আলোচিত সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরিচালন সক্ষমতা ও সামরিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে বিষয়টি এখনো পর্যালোচনায় রয়েছে।
হরমুজ ইস্যুতেও বাড়ছে চাপ
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা নীতিতেও। হরমুজ প্রণালিতে নৌ-নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সামরিক বাহিনী মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ নিতে হলে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, মন্ত্রিসভা এবং জাতীয় পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফিলিপাইনের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অটুট রাখার পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক ও পশ্চিমা অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার পথেই এগোচ্ছে ম্যানিলা।
মন্তব্য করুন