
UD 24 News 🗞️
আরব সাগরে ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর দুটি জাহাজের সংঘর্ষকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের এই ঘটনার পর উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে এবং পরদিন দিল্লি ও ইসলামাবাদে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ২০২৫ সালের মে মাসের চার দিনের সামরিক সংঘাতের পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ওই সংঘাতে দুই দেশ বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের পর যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল। ফলে সমুদ্রে সামরিক জাহাজের সরাসরি সংঘর্ষ নতুন করে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উত্তর আরব সাগরে একটি ভারতীয় নৌযান নিয়মিত নজরদারি মিশনে থাকার সময় পাকিস্তানের একটি নৌযান সেটির কাছাকাছি চলে আসে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি জাহাজটি উচ্চ গতিতে এগিয়ে এসে অনিরাপদভাবে গতিপথ পরিবর্তন করায় সংঘর্ষ ঘটে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনে পাকিস্তানি জাহাজটিকে PNS Hunain এবং ভারতীয় যুদ্ধজাহাজটিকে INS Kolkata হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে সরকারি বিবৃতিতে সব জাহাজের নাম প্রকাশ করা হয়নি। সংঘর্ষের স্থান ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও দুই দেশের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটেছে এবং এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। দিল্লির অভিযোগ, পাকিস্তানি নৌ ইউনিটের আচরণ ছিল ‘অগ্রহণযোগ্য ও অপেশাদার’।
ইসলামাবাদ অবশ্য ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে দেখছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ পাকিস্তানের Exclusive Economic Zone (EEZ)-এর মধ্যে প্রবেশ করেছিল এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর মহড়ার এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় দেশটির নৌবাহিনী SEASPARK-26 নামে দ্বিবার্ষিক সামরিক মহড়া পরিচালনা করছিল, যা ১ সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তানের EEZ এলাকায় চলছিল। ইসলামাবাদ ভারতীয় জাহাজের গতিবিধিকে উসকানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিযোগ করেছে।
পাকিস্তান আরও দাবি করেছে, ভারতীয় নৌযানের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের মধ্যকার সামরিক যোগাযোগ ও মহড়া-সংক্রান্ত বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ ঘটনায় ইসলামাবাদ দিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ঘটনার পর ১৬ সেপ্টেম্বর ভারত নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। ভারত পাকিস্তানকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সামরিক ইউনিটগুলোকে সতর্ক থাকার এবং দুই দেশের প্রাসঙ্গিক চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানও ইসলামাবাদে ভারতের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে পাল্টা প্রতিবাদ জানায়। অর্থাৎ, সামুদ্রিক একটি ঘটনা দ্রুতই দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক বিরোধে রূপ নেয়।
ভারত বলছে, সমুদ্রে দুই দেশের নৌ ইউনিটের চলাচল ও পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে ১৯৯১ সালের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার বিধান রয়েছে। দিল্লির অভিযোগ, পাকিস্তানি নৌ ইউনিটের আচরণ সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
অন্যদিকে পাকিস্তানও একই ধরনের দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ তুলে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে শুধু সংঘর্ষের দায় নয়, ঘটনাটি কোন জলসীমায় ঘটেছে এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির কোন বিধান প্রযোজ্য—এসব বিষয়েও দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা রয়েছে। ২০২৫ সালের সংঘাতের পর সমুদ্রে এমন সরাসরি সামরিক মুখোমুখি পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে দুই দেশের সরকারই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে।
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। দুই পক্ষের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী হওয়ায় সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং দায় কার—তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীন তথ্য এখনো সীমিত।
তবে ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের সামরিক ইউনিটের মধ্যে সমুদ্রে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কীভাবে দ্রুত কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন