
বাংলাদেশে হাম–রুবেলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: টিকা দেওয়ার পরও হাজারের বেশি মৃত্যুর কারণ কী?
ঢাকা: বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি চালালেও মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট হিসেবে মোট ১ হাজার ৯টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীর মৃত্যু ১০০টি, আর সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যু হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে আরও ৯০৯টি।
চলতি বছর হামের বিস্তার বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাত্র এক বছর আগে, ২০২৫ সালে দেশে মোট ১৩২টি হাম শনাক্তের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল এবং কোনো মৃত্যুর খবর ছিল না। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতির এত বড় পরিবর্তন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা, তবুও থামছে না সংক্রমণ
হাম মোকাবিলায় এপ্রিল থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি—প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যার দিক থেকে এই সাফল্য উল্লেখযোগ্য হলেও জাতীয় পর্যায়ের মোট টিকাদানের হার দিয়ে দেশের সব এলাকার বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, কোনো এলাকায় টিকার আওতা ভালো থাকলেও অন্য কোনো এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যেতে পারে। এসব এলাকায় সংবেদনশীল শিশুদের সংখ্যা বেশি হলে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।
টিকা নেওয়ার পর অসুস্থতা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ
শরীয়তপুরের এক বছর বয়সী শিশু সাইফ হাসানের ঘটনাটি চলমান পরিস্থিতির একটি করুণ উদাহরণ। জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার পর তাকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২৭ আগস্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যু হয়।
সাইফ এর কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো হাম-রুবেলার টিকা নিয়েছিল। ফলে পরিবারের মধ্যে টিকা নেওয়ার পরই অসুস্থতার সূত্রপাত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রেবাশ পলের মতে, টিকা শিশুটিকে অসুস্থ করে তুলেছে—এমনটি মনে করার কারণ নেই। তার ধারণা, টিকা নেওয়ার আগেই শিশুটি হামে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে। কারণ টিকা দেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে। একই সঙ্গে সাইফ আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের একটি সমস্যার চিকিৎসা নিচ্ছিল। হাম সংক্রমণের কারণে সেই শারীরিক জটিলতা আরও বেড়ে গিয়ে তার অবস্থার অবনতি হতে পারে।
টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন
বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিশেষজ্ঞরা টিকা প্রয়োজন এমন শিশুর সংখ্যা নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আনছেন।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জরুরি কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবধান ইঙ্গিত দিতে পারে যে শুরুতে টিকা প্রয়োজন এমন শিশুর প্রকৃত সংখ্যা যথাযথভাবে নিরূপণ করা হয়নি। পাশাপাশি দেশের গড় বা জাতীয় পর্যায়ের টিকাদানের হিসাবের আড়ালে এমন কিছু এলাকা থাকতে পারে, যেখানে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম প্রতিরোধী নয়।
কেন এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি?
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। কোনো এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকার আওতায় না থাকলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত অনেকের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে এবারের পরিস্থিতিতে শুধু মোট কত ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন এলাকার কত শিশু টিকা পেয়েছে, কারা টিকার বাইরে রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছেছে—এসব বিষয়ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে তাই জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ২ কোটি টিকা দেওয়ার তথ্যের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের উপস্থিতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এক বছরে শূন্য মৃত্যু থেকে হাজারের বেশি
চলমান সংকটের ভয়াবহতা বোঝাতে গত বছরের পরিসংখ্যানটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ১৩২টি হাম আক্রান্তের ঘটনা নথিভুক্ত হলেও কোনো মৃত্যুর তথ্য ছিল না। আর চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯টিতে।
তবে সরকারি হিসাবের একটি বড় অংশ সন্দেহভাজন মৃত্যুর শ্রেণিতে রয়েছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর মৃত্যু ১০০টি, আর ৯০৯টি মৃত্যু সন্দেহভাজন হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে সব মৃত্যুর ক্ষেত্রে হামই একমাত্র কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে মৃত্যুগুলোর শ্রেণিবিন্যাস ও নিশ্চিতকরণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বাংলাদেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির বড় পরিসরের সাফল্যের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টিকার আওতায় ঘাটতি থাকা এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধু মোট টিকার সংখ্যা বাড়ানো নয়, কোথায় এবং কোন শিশুরা এখনো সুরক্ষার বাইরে রয়েছে—সেটি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন