
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে লবণাক্ত পানি শোধনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
চাঁদপুর ও মোংলায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ, পাইপলাইনে সারা দেশে পরিশোধিত পানি পৌঁছানোর পরিকল্পনা
ঢাকা: ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে বিকল্প উৎস হিসেবে লবণাক্ত পানি শোধনের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে নদীর মোহনা এলাকায় চাঁদপুর এবং সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল মোংলায় পানি শোধন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দেশের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং এ খাতে ডেনমার্কের সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে নিরাপদ পানি সরবরাহে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকার পানির বড় একটি অংশ এখনো ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করা হয়। বর্তমানে ঢাকা শহরে ব্যবহৃত প্রায় ৭৪ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে তোলা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও পানির স্তরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নদী ও সমুদ্রের লবণাক্ত পানি আধুনিক প্রযুক্তিতে শোধন করে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য হলে ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার মতো পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিশোধিত পানি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চাঁদপুর ও মোংলায় কেন ফিজিবিলিটি স্টাডি?
প্রতিমন্ত্রী জানান, লবণাক্ত পানি শোধনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে চাঁদপুরের নদীর মোহনা এবং মোংলার উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
চাঁদপুরের নদীবিধৌত অবস্থান এবং মোংলার সমুদ্র উপকূলীয় অবস্থান—দুই ধরনের জলস्रोत থেকে পানি সংগ্রহ ও শোধনের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয়, পানি শোধনের প্রযুক্তি, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদে পানি সরবরাহের সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে শুধু ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী উৎস থেকে নিরাপদ পানি সরবরাহের একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
মেঘনা থেকে ঢাকায় আসবে বিপুল পরিমাণ পানি
রাজধানীর পানি সংকট মোকাবিলায় মেঘনা নদী থেকে পানি আনার একটি বড় প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেঘনা নদী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ কোটি লিটার পানি শোধন করে ঢাকা শহরে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পে ডেনমার্কের আর্থিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করতে দেশটি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিতে পারে। এর একটি অংশ অনুদান হিসেবে এবং বাকি অর্থ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থায় পরিশোধের সুযোগ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি খাতে বাড়ছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে পানি সরবরাহের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পানি শোধন বা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থায় সহায়তার জন্য ডেনমার্কের পক্ষ থেকে ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প খুঁজছে সরকার
বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো—অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও বাড়ছে।
এ কারণে সরকার এখন নদীর পানি, ভূ-পৃষ্ঠের পানি এবং লবণাক্ত পানি শোধনের মতো বিকল্প উৎস ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। চাঁদপুর ও মোংলায় সম্ভাব্যতা যাচাই সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে।
UD 24 News মনে করছে, নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। লবণাক্ত পানি শোধনের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ফিজিবিলিটি স্টাডির ফল এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর।
–
মন্তব্য করুন