
UD 24 News 🗞️
ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি, রংপুরের চার খুনে নতুন প্রশ্ন
রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের ফলাফল ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পরীক্ষায় তাদের শরীরে মাদক গ্রহণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়েছিলেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে মোট নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা স্বীকার করেছিলেন।
তবে আদালতের নির্দেশে করা সাম্প্রতিক ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কেন ডোপ টেস্ট নেগেটিভ হলো?
রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তথ্য অনুযায়ী, মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের অনুমতি নিয়ে দুই আসামির প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেই নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার প্রতিবেদনে অ্যামফিটামিন বা মেথামফেটামিনজাতীয় মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ডোপ টেস্টে সরাসরি ‘ইয়াবা’ নামের মাদক শনাক্ত করা হয় না। ইয়াবায় থাকা প্রধান মাদকীয় উপাদান অ্যামফিটামিন বা মেথামফেটামিনের উপস্থিতি খোঁজা হয়। কিন্তু শরীরে এই উপাদানগুলোর উপস্থিতি সবসময় দীর্ঘদিন থাকে না।
রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত মাদক গ্রহণকারীর ক্ষেত্রেও প্রস্রাবে অ্যামফিটামিন সাধারণত কয়েক দিন পর্যন্ত শনাক্তযোগ্য থাকে। এরপর পরীক্ষায় তা আর ধরা নাও পড়তে পারে।
আটকের কয়েক দিন পর পরীক্ষা হওয়ায় প্রভাব পড়েছে?
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসামিদের ডোপ টেস্টের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গ্রেপ্তারের পরপরই। তবে তারা কারাগারে থাকায় আদালতের অনুমতি নেওয়া, আদেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো এবং এরপর নমুনা সংগ্রহ—সব মিলিয়ে বেশ কিছুটা সময় চলে যায়।
ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর দাবি, নমুনা সংগ্রহের সময় পর্যন্ত গ্রেপ্তারের পর প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন অতিক্রান্ত হয়েছিল। ফলে প্রস্রাবের নমুনায় অ্যামফিটামিন পাওয়া না যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
চুলের নমুনায় কি পাওয়া যেতে পারে মাদকের প্রমাণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরে মাদক গ্রহণের চিহ্ন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নমুনার ধরন গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত ও লালার তুলনায় প্রস্রাবে মাদকের উপাদান কিছুটা বেশি সময় শনাক্ত হতে পারে। তবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের তথ্য দিতে পারে চুলের নমুনা।
রংপুর মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. রাশেদুল হকের মতে, চুলের নমুনায় মাদক গ্রহণের চিহ্ন প্রায় ৯০ দিন পর্যন্ত শনাক্ত করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে দেশে এ ধরনের হেয়ার স্পেসিমেন পরীক্ষা সহজলভ্য নয় এবং প্রয়োজনে নমুনা দেশের বাইরে পাঠাতে হতে পারে, যা ব্যয়বহুল।
তদন্তে এখন কী হবে?
ডোপ টেস্ট নেগেটিভ হওয়ায় মামলার তদন্তে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হলেও এর মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আসামিদের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ডোপ টেস্ট মূলত পরীক্ষার সময় শরীরে নির্দিষ্ট মাদকীয় উপাদানের উপস্থিতি ছিল কি না, সে বিষয়ে তথ্য দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, চুলের নমুনা পরীক্ষা করা হবে কি না—এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হতে পারে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এদিকে চারজনকে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ডোপ টেস্টের ফলাফল, আসামিদের দেওয়া বক্তব্য এবং অন্যান্য তদন্ত-প্রমাণ—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের পরবর্তী ধাপে কোন তথ্য সামনে আসে, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন