
UD 24 News 🗞️
বিমান হামলা, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ও চীনের সমর্থনে মিয়ানমারে ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জান্তা
মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা বিদ্রোহী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকে পিছু হটছে। ব্যাপক বিমান হামলা, নতুন করে সেনা নিয়োগ এবং চীনের কূটনৈতিক ও অন্যান্য সহায়তা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে হারানো এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর সাম্প্রতিক বড় উদাহরণ ভারতের সীমান্তের কাছে অবস্থিত চিন রাজ্যের ফালাম শহর। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সেখান থেকে বিদ্রোহী যোদ্ধারা পিছু হটে। তাদের দাবি, দীর্ঘ ছয় মাসের সামরিক অভিযানের পর গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা শহরটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
ফালাম দখলে নিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কয়েকশ বিমান হামলা চালায়। পাশাপাশি প্রায় এক হাজার সেনা নিয়ে স্থল অভিযানও পরিচালনা করা হয়। এর আগে প্রায় এক বছর শহরটির নিয়ন্ত্রণ ছিল জান্তা-বিরোধীদের হাতে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফালাম
ফালাম চিন রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। সেখানে রাজ্যটির একমাত্র বিমানবন্দর রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সীমান্তের দিকে যাতায়াত ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটের ওপর শহরটির অবস্থান।
ফলে ফালামের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জন্য শুধু একটি শহর পুনর্দখল নয়, বরং কৌশলগতভাবেও বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চিন ব্রাদারহুডের সদস্য সালাই উইলিয়াম চিন আল জাজিরাকে বলেন, কোনো শহর দখল করা এবং দীর্ঘ সময় সেটি ধরে রাখা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
তার মতে, একটি শহর ধরে রাখতে পর্যাপ্ত জনবল, রসদ, প্রশাসনিক সক্ষমতা, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে নিয়মিত বিমান হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা প্রয়োজন।
দ্রুত বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের চিত্র
ফালামের পতনের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চিন রাজ্যের আরও তিনটি শহর জান্তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মে মাসের শেষ নাগাদ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দাবি করে, তারা চিন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে।
এ ঘটনা দেশটির সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহী ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো কয়েক ডজন শহর দখল করেছিল। তখন সামরিক বাহিনী বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। বিদ্রোহীরা তাদের দখলে থাকা বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
বিমান শক্তিই বড় পার্থক্য তৈরি করছে
বিদ্রোহীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান সক্ষমতা। স্থলভাগে জান্তার বিরুদ্ধে কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য পেলেও বিমান হামলা মোকাবিলা করা বিদ্রোহীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফালামের মতো শহরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে গিয়ে বিদ্রোহীরা বারবার বিমান হামলার মুখে পড়েছে। পর্যাপ্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জনবল না থাকলে এসব হামলার পর শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগে বাড়ছে জান্তার জনবল
সামরিক বাহিনীর ঘাটতি পূরণে মিয়ানমারে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালে জান্তা সরকার দীর্ঘদিন ধরে কার্যত স্থগিত থাকা জাতীয় সামরিক পরিষেবা আইন কার্যকর করে।
এর মাধ্যমে তরুণদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা শুরু হয়। নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এতে দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির কারণে জনবল সংকটে থাকা সামরিক বাহিনী কিছুটা হলেও নতুন শক্তি পেয়েছে।
চীনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। বেইজিং মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি দেশটির সংঘাত কমাতে মধ্যস্থতার উদ্যোগও নিয়েছে।
চীনের প্রভাব বিশেষ করে উত্তর মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা সরকারের মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতি জান্তার জন্য কিছু এলাকায় সামরিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিদ্রোহীদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন
মিয়ানমারের জান্তা-বিরোধী গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য এলাকা দখল করলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহর দখলের পর সেখানে প্রশাসন চালানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রসদ সরবরাহ বজায় রাখা এবং বিমান হামলা প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা না থাকলে সামরিক বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সেসব এলাকা পুনর্দখল করতে পারে।
ফালামের ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে শুধু নতুন এলাকা দখল করাই যথেষ্ট নয়—দখল করা এলাকা কতদিন ধরে রাখা যাচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন